আজ ঈদ

মিথিলা গতকাল দুপুর থেকে কেমন নিশ্চুপ হয়ে ছিল। তবে আমার সাথে যতবারই কথা বলেছে জোর করে মুখে হাসি নিয়ে বলেছে। আমিও স্বাভাবিকভাবেই সব কিছু করেছি। ওর মনে কী চলছে আমার জানা নেই। ও আমাকে নিয়ে কী ভাবছে তাও আমার কাছে অস্পষ্ট। গত কয়েক মাস ধরে নিজেকেই মনে হয় যেন হাত পা বেধে রাখা কোন পশু আমি। শত চেষ্টা করেও যেই বাঁধন আমি খুলতে পারছি না। আল মালিক ভাল জানেন কেন এমন হচ্ছে।

বিকাল থেকে বাচ্চা দুটো বায়না ধরেছিল গরু ছাগল দেখতে যাবে। গ্যারেজে ভাড়াটিয়া আর বাড়িওয়ালার গরু ছাগল বেধে রাখা হয়েছে। আবদার পূরণ করতে নিয়ে গেলাম। এমন ছোটখাটো আবদার গুলো পূরণ হলে বাচ্চারা অনেক বেশি খুশি হয়। ওদের খুশি দেখলে আমারো মনটা ভাল হয়ে যায়। যদিও সেটা আমি শত চেষ্টা করেও প্রকাশ করতে পারিনা!

বাসায় ফিরে বড় ছেলেটা ছুটে গেল মায়ের কাছে, আম্মু আমরা ছাগল কিনব না?

মিথিলা তার হাসি মাখা মুখেই ছেলের সামনে হাটু গেড়ে বসে তার চোখের দিকে তাকিয়ে উত্তর দিল, না বাবা এবার আমরা কুরবানি দিতে পারছি না। আল্লাহ্‌ যেদিন আমাদের আবার তাওফিক দিবেন সেদিন ইন শা আল্লাহ্‌ দিব। তুমি খুউব করে দুয়া করে দাও যেন আগামী বছর আমরা দিতে পারি!

ছেলের মুখে কাল ঘনঘটা! এরপরের দৃশ্য দেখার শক্তি আমার নেই। ৩/৪ মাস ধরে ছেলে যাই চায় মিথিলার একই ধরনের উত্তরে সে প্রথম প্রথম মেনে নিলেও এখন তারও যে কিছুটা মন খারাপ হয় সেটা চেহারাতেই ফুটে উঠে! কেমন অসহায় কান্না কান্না চোখে চেয়ে থাকে। মিথিলা খুব সুন্দর করে সেই দৃশ্য ইগ্নোর করে ওকে অন্য কাজে ব্যস্ত করে ফেলে আর আমি কেটে পরি। আমার চোখে ছেলের সেই চেহারাটাই ভেসে ওঠে বার বার।

রাতে খুব জিজ্ঞেস করতে মন চাচ্ছিল, মিথিলা মেহদী দিবা না এবার? ওর মেহদী দেওয়া হাত দেখতে খুব সুন্দর লাগে। কেমন বউ বউ একটা ভাব থাকে হাতটিতে। পারিনি। সব কথাই ইদানিং গলায় দলা পাকিয়ে আটকে যায়। বাচ্চাদের ঘুম পাড়িয়ে মিথিলা নিজেও ঘুমিয়ে গেল, প্রতি রাতের মত আমার রাতটা কাটলো আমার রবের সাথে।

ভোরে উঠে দেখি মিথিলা রুটি দুধ দিয়ে কী কী বানিয়ে ফেলেছে। কিছু নাই থেকে এই মেয়ে কী কী সব বানিয়ে ফেলে আমি আশ্চর্য হয়ে যাই মাঝে মাঝে! ফজর পড়তে বের হচ্ছি মনে বাজছিল ছেলের রাতে কথাগুলো,

মা, নিচ তলার রূপম আর রূপা নাকি ঈদের জামা কিনেছে! ঈদের আবার জামা কী?
পাশ থেকে ছোট মেয়ে আধো বোলে বলে যাচ্ছে, বু জামা বু জামা! (অর্থাৎ ব্লু জামা!)

মিথিলা বাচ্চাদের ঈদের জন্য আলাদা জামা কিনতে হবে এটা কখনোই শেখায়নি, কিন্তু সমাজ এই দায়ীত্বটা প্রতি নিয়ত পালন করে যাচ্ছে! ও বুঝিয়ে বলল, ঈদে সব চেয়ে সুন্দর আর পরিষ্কার জামাটি পড়তে হয়, নতুনই লাগবে তা না। আমি চেষ্টা করি মাঝে মাঝে বোঝাতে কিন্তু কথা গুছিয়ে উঠতে পারিনা। বাচ্চাদের মনে এখন অনেক প্রশ্ন জাগে সেগুলোর যথাযথ উত্তর না পেলে কনফিউজড হয়ে যায় আসলে। আর আমি সব মনে মনে সাজিয়ে রাখলেও উত্তর দেওয়ার সময় কেন জানি গোলমাল বাধিয়ে ফেলি!

ফজরের সালাহ পড়ে ঘরে ফিরেই দেখি দরজার সামনে মিথিলা ৪টা ব্যাগ আর পার্সেল নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। চোখে মুখে বিস্ময়! আমিও হতবাক এগুলা কী? ঘরে ঢুকতেই মিথিলা ৫মিনিট ধরে যা বলল, তার সারমর্ম হল, আমরা গত পরশু বাসার বাইরে ছিলাম সেদিনই নাকি এই ৪টা পার্সেল এসেছিল, বাড়িওয়ালার দোকানে রেখে দিয়েছিল এরপর উনি নিজেই ভুলে গেছেন। আজকে ফজর পড়তে যাওয়ার সময় তার খেয়াল হওয়াতে দিয়ে গিয়েছেন আর খুউব করে সরি বলেছেন। বলতে বলতেই পার্সেল খুলছে মিথিলা।

একটা এসেছে ওর বড় ভাই এর বাসা থেকে। শ্বশুর শাশুড়ি আর বড় ভাই ভাবি বাচ্চাদের জন্য দুই সেট করে জামা, আমার জন্য পাঞ্জাবি, মিথিলার জন্য জামা আরো কি কি সব কস্মেটিক্স পাঠিয়েছেন। আরেকটা ওর বান্ধবী দেশের বাইরে থেকে রিসেন্টলি এসেছেন সেও বাচ্চাদের জন্য জামা জুতা ক্লিপ, মিথিলার জন্য একগাদা মেকাপের হাবিজাবি আর আমার জন্য ঘড়ি পাঠিয়েছেন। এরপরের টা এক দ্বীনি ভাই দিয়েছেন, কিছু আতর, একটা পাজাবী, একটা ওয়ালেট, মিথিলার জন্য পার্স আর বাচ্চাদের জন্য কিছু বই।
শেষ পার্সেল টা খুলে দেখি আমার এক বন্ধুর ছোট ভাই বাচ্চাদের জন্য একগাদা চকলেট আর খেলনা পাঠিয়েছে।

মিথিলার মুখ দিয়ে, “সুবহানআল্লাহ!” শুধু শুনলাম!
আমি মনে মনে বললাম, আর রাজ্জাক আপনি কোথা কোথা থেকে যে আমাদের রিযিক রেখেছেন!
হাসবো না কাঁদবো বুঝতে পারছিলাম না! মিথিলা কে বললাম গুছিয়ে ফেলো সব কিছু বাচ্চাদের ডেকে তুলো। সব কিছু গুছাতে গুছাতে ও বলছিলো, পূরনো জিনিষগুলো কিছু দিয়ে দিতে হবে এতো কিছু রাখার তো আসলে কোন দরকার নাই.. আরো কী কী বলছিল জানি।

হঠাত মনে পড়লো,
– মিথিলা মোবাইলটা খুঁজে পেয়েছো? গতকাল দুপুর থেকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছিল না।
সকালে ঘর ঝাট দিতে গিয়ে সে খাটের তলা থেকে নাকি উদ্ধার করেছে ফোন! সেটা চার্জে। আনতে গিয়ে দিল আরেক চিৎকার! ২০টা মেসেজ! ৩০টা মিসড কল! সব ওর বাসা থেকে, পার্সেল পেয়েছি কিনা জানার জন্য। এসব নিয়ে ও ব্যস্ত হয়ে পড়লো আমি এই ফাকে অনেককেই ফোন দিলাম। ঘন্টা খানেক পর বেল বাজা শুরু হল, প্রতিবেশি কিছু মাংস পাঠিয়েছে। এর পর দ্বীনি ভাই দের বাসা থেকে এল। দুপুর নাগাদ মিথিলা চোখ বড় বড় করব বলল, তূর্য ফ্রিজে তো আটছে না!
“সুবহানআল্লাহ!”
ও সেখান থেকে কিছু দানের জন্য আলাদা করে ফেলল।

দুপুরে আমার বড় বোন নানা পদের খাবার রান্না করে পাঠিয়েছে, সাথে বাচ্চাদের জন্য খেলনা আর জুতা। কাজের ব্যস্ততায় বাচ্চাদের জিনিষগুলো আগে পাঠাতে পারেনি তাই ফোন দিয়েও অনেক দুখ করলো। আব্বা আম্মা বেচে থাকতেও ও আমার জন্য ঈদের দিন খাবার পাঠাতোই, কোন মিস নাই!

আমি অবাক হতে হতে অবাক হওয়া ছেড়ে দিলাম…
বিকালে একটু বের হব বাচ্চাদের নিয়ে এমন সময় ফোন এল, এলাকার এক ছোট ভাই! কুশল বিনিময়ের পর বলল, ভাইয়া আপনার সিভিটা দুলাভাই কে দিয়েছিলাম, আজকে উনাদের বাসায় যাওয়াতে বলল আর্জেন্ট বেসিসে আপনাকে উনারা নিতে চান। ঈদের ৪/৫ দিন পর উনাদের অফিসে ইন্টারভিউ। জব কনফার্ম কিন্তু জাস্ট ফর্মালিটিস এর কিছু ব্যাপার আছে তাই ইন্টার্ভিউ নিবেন….

-মিথিলাআআআ,
ছুটে এসে জিজ্ঞেস করলো, কী হল?
– জব হয়েছে!
– সে বিজ্ঞের মত হেসে বলল, বলেছিলাম না ধৈর্য ধর? তো কোথায় হল? শ দুয়েক জায়গায় তো ফেলেছো সিভি। মনেও নাই কিসে কিসে….

আমি সন্ধ্যায় সন্ধ্যা তারাটি দেখছি আর ভাবছি। আজ আমাদের ঈদ ছিল। গত ১০মাসের চাকুরীহীন সংসারের একটি স্মরণীয় ঈদ।

*** আল্লাহ্‌ তাকে তার ধারণাতীত যায়গা থেকে রিযিক দিবেন…..
– সূরা ত্বালাক : ৩ ***


সাকিবা আহমেদ
২৩ আগষ্ট ২০১৮